সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ক্লাস রুটিন কী বলছে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ক্লাস রুটিন কী বলছে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ক্লাস রুটিন প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষক সমাজে আলোচনা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নির্ধারিত এই রুটিনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসের সময় এবং শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস রুটিন পরিবর্তনের ফলে এক শিফট ও দুই শিফট—দুই ধরনের বিদ্যালয়েই সময় বেড়েছে। পাশাপাশি নতুন ছুটির তালিকায় শুক্র ও শনিবার গণনা এবং রমজান মাসে পর্যাপ্ত ছুটি না থাকার বিষয়টিও শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ক্লাস রুটিন কী বলছে

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি থেকে দেওয়া ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস রুটিন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচিতে সরাসরি পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষকদের দৈনিক কর্মঘণ্টা আগের তুলনায় বেড়েছে, যা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছেন।

এক শিফট বিদ্যালয়ে সময় বৃদ্ধির হিসাব

২০২৫ সালের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রুটিন অনুযায়ী এক শিফটের বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস শেষ হতো দুপুর ৩টা ৩০ মিনিটে। নতুন ২০২৬ সালের রুটিনে সেই সময় বাড়িয়ে বিকাল ৪টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, এক শিফটের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাসের সময় সরাসরি ৩০ মিনিট বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে অবস্থানের সময়ও আধা ঘণ্টা বেড়ে গেল।

দুই শিফট বিদ্যালয়ে বাড়ল ১৫ মিনিট

দুই শিফটের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২০২৫ সালে ছুটি হতো বিকাল ৪টায়। কিন্তু নতুন রুটিন অনুযায়ী ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে দুই শিফটের বিদ্যালয়ে ছুটি হবে বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে। ফলে দুই শিফটের বিদ্যালয়েও শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা ১৫ মিনিট বাড়ানো হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, সময় বাড়লেও পাঠদানের মান বাড়বে—এর নিশ্চয়তা নেই।

আরও জানতে পারেনঃ ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে না বাংলাদেশ? আইসিসির জবাবের অপেক্ষায় বিসিবি

কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষক নেতাদের প্রতিক্রিয়া

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতারা এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ক্লাস রুটিন তৈরির আগে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। শিক্ষকরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করেন, তাই কোন শ্রেণিতে কত সময় প্রয়োজন, সেটি তারাই ভালো বোঝেন।

একজন শিক্ষক নেতা বলেন, পড়ান শিক্ষকরা, অথচ রুটিন তৈরি করেন কর্মকর্তারা—এটা বাস্তবসম্মত নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি স্কুলের পরিবেশ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও বাস্তবতা ভিন্ন। সেই অনুযায়ী স্কুলভিত্তিক রুটিন তৈরির সুযোগ থাকলে পাঠদানের মান আরও ভালো হতো।

সময় বাড়লেই কি শেখা বাড়ে

শিক্ষকদের আরেকটি বড় যুক্তি হলো, বেশি সময় মানেই ভালো শিক্ষা নয়। অনেক ক্ষেত্রে আন্তরিকতা, দক্ষতা ও সঠিক পদ্ধতিতে কম সময়েও কার্যকর পাঠদান সম্ভব। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শেখার বিষয়টি শুধু সময়ের ওপর নির্ভর করে না। বরং শিক্ষকের প্রস্তুতি, ক্লাস ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগই এখানে বড় বিষয়।

নতুন ছুটির তালিকা নিয়ে বিতর্ক

ক্লাস রুটিনের পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ছুটির তালিকায় শুক্র ও শনিবারকে ছুটির দিনের হিসেবে গণনা করা হয়েছে, যা আগে করা হতো না। এই পরিবর্তন শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।

শুক্র ও শনিবার গণনার অসঙ্গতি

আগের বছরগুলোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকায় শুক্র ও শনিবারকে ‘শূন্য দিন’ হিসেবে ধরা হতো। অর্থাৎ, এই সাপ্তাহিক ছুটিগুলো মূল ছুটির হিসাবের মধ্যে পড়ত না। কিন্তু নতুন ছুটির তালিকায় দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে শুক্র ও শনিবারকে ছুটির দিনের অংশ হিসেবে যোগ করা হয়েছে।

একই তালিকায় কোথাও শুক্র-শনিবার বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও যুক্ত করা হয়েছে। এতে মোট ছুটির দিনের হিসাব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। শিক্ষক সংগঠনগুলো বলছে, এটি হয়তো অনিচ্ছাকৃত ভুল বা প্রিন্টিং সমস্যার কারণে হতে পারে, তবে বিষয়টি দ্রুত সংশোধন করা দরকার।

রমজান মাসে ছুটি কম থাকার অভিযোগ

রমজান মাসের ছুটি নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি। শিক্ষকরা বলছেন, রমজান মুসলমানদের জন্য একটি পবিত্র ও সংযমের মাস। এই সময় রোজা রেখে দীর্ঘ সময় ক্লাস নেওয়া শিক্ষকদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বাস্তবতা

অনেক প্রাথমিক শিক্ষার্থীও রোজা রেখে বিদ্যালয়ে আসে। কোমলমতি এসব শিক্ষার্থীর জন্য দীর্ঘ সময় ক্লাস করা শারীরিকভাবে কঠিন। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষক নারী। বিদ্যালয়ের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে ইফতার প্রস্তুতির চাপও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় শিক্ষক সংগঠনগুলো রমজান মাসে কমপক্ষে ১৫ দিনের ছুটির দাবি জানিয়েছে। তারা বলছেন, ছুটি বাড়ালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়ের জন্যই স্বস্তিদায়ক হবে।

শ্রান্তি বিনোদন ভাতা নিয়ে জটিলতা

নতুন ছুটির তালিকার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে শ্রান্তি বিনোদন ভাতার ক্ষেত্রে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে এই ভাতা পান। কিন্তু এর জন্য টানা ১৫ দিনের ছুটি শিক্ষাপঞ্জিতে থাকতে হয়।

শিক্ষকরা বলছেন, নতুন ছুটির তালিকায় শুক্র ও শনিবার যুক্ত করায় প্রকৃত ছুটির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে শ্রান্তি বিনোদন ভাতা পেতে এক বছর বেশি অপেক্ষা করতে হতে পারে। আগে যেখানে তিন বছরে ভাতা পাওয়ার সুযোগ ছিল, সেখানে এখন চার বছর লেগে যেতে পারে।

শিক্ষক সংগঠনগুলোর যৌথ দাবি

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২টি সংগঠন নিয়ে গঠিত একটি জোট বছরে টানা দুইবার ১৫ দিনের ছুটি রাখার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এই ছুটি না থাকলে শিক্ষকরা মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, যা শিক্ষার মানের ওপর প্রভাব ফেলবে।

তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়ে ছুটির তালিকা সংশোধন, রমজান মাসে ছুটি বৃদ্ধি এবং শুক্র-শনিবার গণনার অসঙ্গতি দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন।

কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ

শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, তারা বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের আশা, শিক্ষক ও কর্মকর্তারা একসঙ্গে বসে আলোচনা করলে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান বের হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে শিক্ষক মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলেও তারা মনে করেন।

প্রশ্ন-উত্তর

প্রশ্ন: নতুন রুটিনে এক শিফট বিদ্যালয়ে কত সময় বেড়েছে?
উত্তর: এক শিফটের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাসের সময় ৩০ মিনিট বেড়েছে।

প্রশ্ন: দুই শিফট বিদ্যালয়ে সময় কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে?
উত্তর: দুই শিফটের বিদ্যালয়ে ক্লাসের সময় ১৫ মিনিট বাড়ানো হয়েছে।

প্রশ্ন: রমজান মাসে শিক্ষকদের প্রধান দাবি কী?
উত্তর: রমজান মাসে কমপক্ষে ১৫ দিনের ছুটি বৃদ্ধি করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

প্রশ্ন: শুক্র ও শনিবার গণনা নিয়ে আপত্তি কেন?
উত্তর: আগে শুক্র ও শনিবার ছুটির হিসাবের বাইরে ছিল, এখন কিছু ক্ষেত্রে এগুলো যুক্ত করায় ছুটির প্রকৃত সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

উপসংহার

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ক্লাস রুটিন ও ছুটির তালিকা নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা শুধু সময় বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্নও তুলে ধরছে। শিক্ষকরা চান, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। ক্লাসের সময়, ছুটি এবং কর্মঘণ্টা—এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা গেলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা যায়।

Related posts

Leave a Comment